উপকূলীয় অঞ্চলে হ্যাচারি শিল্পে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধানে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাগদা চিংড়ির রেণু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওশান সি হ্যাচারি’-তে ২৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি অত্যাধুনিক হাইব্রিড সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে এই রূপান্তরকারী প্রকল্পের বিদ্যুৎ সংযোগ ও সার্বিক বাস্তবায়ন কার্যক্রমের শুভ সূচনা ঘটে। সাইমার পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ও জেনিক্সগ্রিন বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। দেশের চিংড়ি হ্যাচারি খাতে এ ধরনের উদ্ভাবনী সৌর প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ এটিই প্রথম।
প্রকল্পের কারিগরি দিক তুলে ধরে সাইমা পাওয়ার টেকনোলজির পরিচালক (অপারেশনস) সাইমা সাজেদুল করিম জানান, “ওশান সি হ্যাচারির সাথে আমাদের ২৫০ কিলোওয়াটের হাইব্রিড সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। চিংড়ি হ্যাচারির বিশেষ প্রক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশে এই প্রথম স্লাইডিং বা ভাঁজযোগ্য বিশেষ প্রযুক্তির সৌর প্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব প্যানেল একপাশে সরিয়ে নেওয়া যাবে, ফলে হ্যাচারির ট্যাংক শুকানোর সময় সম্পূর্ণ জায়গাটি সহজেই খালি করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটির অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক সুবিধার কথা জানিয়ে ওশান সি হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী আব্দুল আজিজ বলেন, “প্রায় ১ কোটি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতিপূর্বে প্রতি বছর হ্যাচারির ছাউনি খুলে কড়া রোদে ট্যাংক শুকাতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। এই স্লাইডিং প্যানেল ব্যবহারের ফলে ট্যাংক শুকানোর কাজ অত্যন্ত সহজ হবে এবং নিয়মিত উৎপাদনও ব্যাহত হবে না। এছাড়া নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারব।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আজিজুর রহমান বলেন, “সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য খাত থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কিনে নিচ্ছে। ওশান হ্যাচারির এই স্লাইডিং প্যানেল প্রযুক্তি উপকূলীয় অন্যান্য চিংড়ি হ্যাচারির জন্যও একটি অনুকরণীয় মডেল হতে পারে।”
উদ্বোধনী দিনে প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ কাঠামোর কারিগরি নকশা, স্লাইডিং প্যানেল স্থাপন পদ্ধতি এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করা হয়। এ সময় চায়না জেনিক্সগ্রিনের পরিচালক মি. ডন, সাইমার পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মো. গোলাম মোস্তফা, জেনিক্সগ্রিন বাংলাদেশের প্রধান প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান এবং ওজোপাডিকোর সাতক্ষীরা অঞ্চলের কর্মকর্তা সোয়াইব হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্যামনগরের এই পরিবেশবান্ধব পথিকৃৎ উদ্যোগ সাফল্য পেলে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য ও হ্যাচারি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি গ্রামীণ ও উপকূলীয় অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।