জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চার নেতার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে প্রসিকিউশন। সোমবার (৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে এ দাবি জানানো হয়।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেলে মামলাটির শুনানি হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এ সময় প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
শুনানি শেষে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক কার্যক্রম এরই মধ্যে শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে কিছু অতিরিক্ত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুনরায় যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। আজ সেই যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে এবং চার আসামির প্রত্যেকের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে।
হানিফের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জুলাইয়ের আন্দোলন দমনে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তে তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন। পরে অধীনস্থদের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন। প্রসিকিউশনের দাবি, একজন বেসামরিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নির্দেশনা দেওয়া এবং টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন হানিফ।
প্রসিকিউটর আরও বলেন, একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দীন নাছিমকে ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। তাই একই পর্যায়ের ভূমিকা থাকায় মাহবুবউল আলম হানিফের ক্ষেত্রেও একই ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন।
হানিফের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে প্রসিকিউশন জানায়, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন এবং জুলাইয়ের আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে উসকানি ও সহযোগিতা করেছেন। ওবায়দুল কাদেরের বিভিন্ন বৈঠকেও তিনি উপস্থিত থেকে এসব সিদ্ধান্তে সমর্থন দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হত্যাকাণ্ড পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও হানিফের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। এসব টেলিফোন কথোপকথনের তথ্য-প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রসিকিউশন।
মাহবুবউল আলম হানিফ ছাড়া মামলার অপর তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। মামলার চার আসামিই বর্তমানে পলাতক।
এর আগে গত ১০ জুন প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তি এবং পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছিল ট্রাইব্যুনাল-২। এর আগে ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার মধ্য দিয়ে মামলায় ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। পরে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত তথ্য-প্রমাণ দাখিল করা হলে মামলাটিতে আবারও যুক্তিতর্কের সুযোগ তৈরি হয়।
গত বছরের ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলাটির বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এর আগে ৫ অক্টোবর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করলে পরদিন ৬ অক্টোবর তা আমলে নেওয়া হয়।
মামলায় চার আসামির বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া, ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকা এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।