নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত ৩০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা গ্রাহকদের আগাম জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে শুরু হওয়া এই সেবা বিঘ্নিত থাকার সময় আগামী ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। হঠাৎ করে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের এটিএম, কার্ড ও পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জরুরি সময়ে টাকা তুলতে গিয়ে অনেক গ্রাহককে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
আইটিসির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পিএসওর নেটওয়ার্কে যুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো হলো সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ কৃষি, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল)। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে আইএফআইসি, যমুনা, উত্তরা, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট, বাংলাদেশ কমার্স, ব্যাংক এশিয়া, মিডল্যান্ড, কমিউনিটি ব্যাংক, ওয়ান, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, মেঘনা, মধুমতি, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, এনআরবিসি, শাহ্জালাল ইসলামী, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড, ইউনিয়ন ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ও সিটিজেন্স ব্যাংক। আর বিদেশী খাতের উরি ও ব্যাংক আলফালাহও এ তালিকায় রয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, নিরাপত্তা জোরদার এবং সিস্টেম আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু কার্ড ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।
কৃষি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে নির্দিষ্ট কিছু সেবা সাময়িকভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
ব্যাংকগুলোর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের লেনদেন বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের এটিএম, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) এবং পিওএস সেবাও সাময়িকভাবে অচল থাকবে।
তবে ডেবিট কার্ডের লেনদেন স্বাভাবিক থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। পাশাপাশি কিউ-ক্যাশের বাইরে থাকা অন্যান্য ব্যাংকের এটিএম ও পিওএস, বাংলা কিউআর এবং বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে—যেমন বিকাশ, নগদ ও উপায়—লেনদেন ও ফান্ড ট্রান্সফার চালু থাকবে। কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফান্ড স্থানান্তরও স্বাভাবিক থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে সিস্টেম আপগ্রেড বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সময় সাময়িকভাবে কিছু সেবা বন্ধ থাকা নতুন ঘটনা নয়। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং কাজের পরিধি অনুযায়ী এ ধরনের কার্যক্রমে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট সেবা সীমিত রাখা হতে পারে। নির্ধারিত কাজ শেষ হলে সেবাগুলো আবার স্বাভাবিক হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, জরুরি লেনদেনের প্রয়োজনে গ্রাহকদের বিকল্প ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলো তাদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে নিয়মিতভাবে সিস্টেম উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে। কোর ব্যাংকিং, কার্ড নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের এ ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বর্তমানে ব্যাংকিং কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে ৩০টি ব্যাংকের একযোগে কিছু সেবা বন্ধ রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আগে অবগত ছিল না বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
তিনি বলেন, নিরাপদ ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ চলছে। এর প্রভাবে আইটিসি তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের কিছু সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নিজেদের উদ্যোগে নিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আগে থেকে অবহিত করা হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কর্মকর্তা আরও জানান, গ্রাহকদের সেবা সাময়িক বন্ধ রাখার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আগাম কোনো বিজ্ঞপ্তি বা ঘোষণা দেয়নি। ফলে হঠাৎ কিছু সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও ভালোভাবে নেননি। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে এককভাবে নেওয়াকে তিনি গর্হিত বলে মনে করছেন। এ ঘটনায় গভর্নর ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলেও জানান তিনি।