মেঘ ছুঁয়ে থাকা সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে এখন সোনালি রঙের জুমের ধান। বাতাসে দুলছে পাকা ধানের শিষ। এর সঙ্গে মিশে আছে পাহাড়ি জুমচাষীদের ঘামঝরা পরিশ্রম আর তৃপ্তির অনুভূতি।কোথাও ধান কাটার ধুম, কোথাও ফসল পাহারা দিতে জুমঘরে নির্ঘুম রাত। আবার কোথাও সাথি ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমচাষীরা।
বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে রোয়াংছড়ি উপজেলার যামিনীপাড়া। পাহাড়ের ঢালে দলবেঁধে জুমের পাকা ধান কাটছিলেন ৫৫ বছর বয়সী রিং লট ম্রো। সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্য ও ৮ জন নারী শ্রমিক। তিন ‘আড়ি’ (প্রতি আড়িতে প্রায় ১০ কেজি ধানের বীজ) দিয়ে প্রায় তিন একর জমিতে জুম করেছেন তিনি। ফলন নিয়ে বেশ আশাবাদী এই জুমচাষী।
রিং লট ম্রো বলেন, “আগে সময় মতো রোদ-বৃষ্টি হলে জুমের ধান ভালো হতো। এখন সময় মতো রোদ-বৃষ্টি হয় না। প্রকৃতিও যেন উল্টো হয়ে গেছে। তারপরও এ বছর জুমের ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।”
তিনি জানান, তিন একর জমি থেকে এবার ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান ঘরে উঠতে পারে। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ফলন আড়াইশ আড়ি পর্যন্ত হতে পারত।
জুমচাষের বৈচিত্র্য তুলে ধরে রিং লট ম্রো বলেন, “জুমে শুধু ধান হয় না। বেগুন, মারফা, তিল, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ, রোজেলাসহ ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের সাথি ফসল হয়। বাজার থেকে তেমন কিছু কিনতে হয় না। জুমের ফলন যেন আমাদের জন্য একটি বাজারের মতো। প্রয়োজনীয় অনেক সবজি এখান থেকেই পাওয়া যায়।”
একই জমিতে ধান কাটছিলেন ১৯ বছর বয়সী তরুণী সংডং ম্রো। কপালের ঘাম মুছে তিনি বলেন, “জুম না করলে আমরা খেতে পারব না। জুম করতেই হবে। প্রতি বছর আমরা জুম চাষ করি। এটা আমাদের ঐতিহ্য।”
জুমচাষীরা জানান, জুমের জীবনচক্র প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে বাঁধা। নভেম্বর-ডিসেম্বরে জুমের জন্য জঙ্গল নির্বাচন করা হয়। জানুয়ারিতে ঝোপঝাড় কাটা শুরু হয়। মার্চ-এপ্রিলের দিকে ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে জঙ্গল পোড়ানো হয়। এরপর বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে বীজ বোনা হয়। আগস্টের শেষ থেকে শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ।
জুমের ধান ঘরে তোলার পর অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ পর্যন্ত বিভিন্ন পাড়ায় শুরু হয় নতুন চালের নবান্ন উৎসব। পাশাপাশি জুমে উৎপাদিত সাথি ফসল পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি করে।
বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর বলেন, “চলতি বছর বান্দরবানে প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন হয়ে থাকে।”
ফলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এ বছর জুমের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে একেক এলাকার ফলন একেক রকম হয়।”
তিনি বলেন, “রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদমে ইতোমধ্যে জুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে। ফলন বাড়াতে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উন্নত ও হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদনে জুমচাষীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।