শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মানসিক যত্ন সহজলভ্য করতে ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’ চালু প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক মাসের জন্য দায়িত্ব চান মিলন ১২ কোটি টাকার সড়কে নিম্নমানের ইট, ভেস্তে যেতে পারে আইনমন্ত্রীর উদ্যোগ চাল, ডিম ও মুরগির দাম বেড়েছে, স্বস্তি নেই মাছের বাজারেও শান্তিতে নোবেল পেলেন মানবাধিকারকর্মী নাভেনথাম নাভি পিলাই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘গো-ডেটা’ টুলের বিপ্লব নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের ঘোষণা দিল যুক্তরাষ্ট্র, কে এই সাবেক মেজর? অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়তে সবার জন্য জায়গা তৈরি করছি: অর্থমন্ত্রী পঞ্চগড়ে আনসার-ভিডিপির প্রশিক্ষণ সমাপনী টেকনাফে কোস্ট গার্ডের অভিযান, কোটি টাকার ইয়াবা জব্দ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘গো-ডেটা’ টুলের বিপ্লব

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে ২০১৭ সালের শীতে যখন ডিফথিরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন ক্যাম্পের একটি ঘিঞ্জি তাঁবুতে দুই সন্তানকে বুকে আগলে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছিল মা ফাতেমা খাতুনের (ছদ্দ নাম)। তার বড় মেয়েটির গলায় তীব্র ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সে সময় কাগজে-কলমে রোগীর তথ্য নথিভুক্ত করার সনাতন ও ধীরগতির ব্যবস্থার কারণে প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশন এবং তথ্য পৌঁছাতেই কয়েক দিন সময় লেগে যায়। ততক্ষণে এই সংক্রামক রোগ ক্যাম্পের বহু শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছিল—যে বেদনা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় সেই জনপদের মানুষদের।

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মানবিক সংকটপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার, যেখানে অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং ঘিঞ্জি পরিবেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন। এখানকার প্রাদুর্ভাবগুলো ঐতিহ্যগত কাগজভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার চেয়ে অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের ডিফথিরিয়ার প্রাদুর্ভাবের সময় এক সপ্তাহেই রোগীর সংখ্যা ৫০ জনে গিয়ে ঠেকে এবং ২০১৮ সালের শুরুর দিকে আরও বড় আকারে তা ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় তদন্তের কাজ কাগজভিত্তিক রেকর্ডের ওপর নির্ভর করায় সংস্পর্শে আসা (কন্টাক্ট ট্রেসিং) ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ধীরগতিতে চলছিল। পাশাপাশি, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের সঠিক পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনীয় ডেটা বিশ্লেষণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ায় রেসপন্স টিমগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘গো-ডেটা’র সংযুক্তি :

এই ব্যবধানগুলো দূর করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বাংলাদেশ সরকার এবং অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে ২০১৯ সালের শেষভাগে চালু করা হয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘গো-ডেটা’। গ্লোবাল আউটব্রেক অ্যালার্ট অ্যান্ড রেসপন্স নেটওয়ারর্ক (জিওএআরএ)-এর মাধ্যমে বিকশিত এই প্ল্যাটফর্মটি মোবাইল কেস এন্ট্রি, স্বয়ংক্রিয় প্রাদুর্ভাব সূচক এবং সংক্রমণের ধারা নিখুঁতভাবে দৃশ্যমান (ভিজ্যুয়ালাইজ) করার সুযোগ করে দেয়। এর ফলে নজরদারি দলগুলো দ্রুত ক্লাস্টারগুলো শনাক্ত করতে এবং এই চ্যালেঞ্জিং ক্যাম্প পরিবেশেও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কমিউনিটি হেলথ ভলিউন্টিয়ার রহিমা খাতুন বলেন, ‘দ্রুত পদক্ষেপই পারে একটি বড় প্রাদুর্ভাব রোধ করতে। আমরা যত দ্রুত রোগীর কাছে পৌঁছাতে পারব, কমিউনিটির মানুষের আস্থা তত বাড়বে এবং রোগ ছড়ানোর আগেই জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। কিন্তু সামান্য দেরি হলেই রোগটা দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যা তখন সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যায়।’

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, “আগে কাগজ-কলমের ধীরগতির কারণে রোগীর কাছে পৌঁছাতে দেরি হতো। এখন ‘গো-ডেটা’ অ্যাপের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়ায় আমরা আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে রোগীর কাছে পৌঁছাতে পারছি। যত দ্রুত আমরা কাজ করতে পারছি, মানুষের আস্থাও তত বাড়ছে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।”

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর ন্যাশনাল হেলথ কর্মকর্তা ডা. আবেদ হাসান বলেন, ‘২০১৭ সালের ডিফথিরিয়া প্রাদুর্ভাবের সময় কাগজভিত্তিক ব্যবস্থা রেসপন্স কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটিয়েছিল এবং সমন্বয় সীমিত করে দিয়েছিল। গো-ডেটা রোগতাত্ত্বিক তদন্তকে একটি দ্রুতগতির, ডেটা-চালিত কার্যক্রমে রূপান্তরিত করেছে।’

ডব্লিউএইচওর আর্লি ওয়ার্নিং, অ্যালার্ট অ্যান্ড রেসপন্স সিস্টেম (ইডব্লিউএআরএস)-এর পাশাপাশি গো-ডেটা মোতায়েন করা হয়, যা জাতীয় রিপোর্টিং ক্ষমতার পরিপূরক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি রোগ তদন্ত ও কন্টাক্ট ট্রেসিংকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। দুটি সিস্টেমের তথ্য একত্রিত হওয়ায় ক্যাম্প এবং স্থানীয় কমিউনিটিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী প্রমাণ মিলেছে।

দক্ষ জনবল তৈরি ও মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন :

শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, এর পাশাপাশি গো-ডেটা চালুর শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞ তৈরি এবং স্থানীয় মালিকানাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ডব্লিউএইচও। ২০১৯ সালে প্ল্যাটফর্মটি চালুর সময় আইওএম, মেডেসিন স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ), সামারিটানস পার্সসহ অন্যান্য অংশীদার সংস্থার ৩০ জন এপিডেমিওলজি ও সার্ভিল্যান্স কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর পরে সরকারি ও অংশীদার সংস্থাসমূহের আরও ৩৫ জন ফোকাল পয়েন্টকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কম সংযোগ (নিম্ন মানের ইন্টারনেট সংযোগ) পরিবেশেও কেস ইনভেস্টিগেশন, কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং ট্রান্সমিশন চেইন ম্যাপিংয়ের ওপর এই প্রশিক্ষণগুলো দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ ও ২০২২ সালে ফলোআপ প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মে মাসে নতুন কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যাতে মাঠপর্যায়ে সবাই কার্যকরভাবে এই টুলটি বাস্তবায়ন করতে পারে।

ফ্রেন্ডশিপ সংস্থার মনিটরিং, ইভ্যালুয়েশন অ্যান্ড লার্নিং কর্মকর্তা মং কে সি মারমা বলেন, ‘গো-ডেটা প্রাদুর্ভাবের তদন্তকে ডিজিটালাইজ করে এবং প্রায় রিয়েল-টাইম বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে আমাদের সেই সংকটগুলো দূর করেছে, যা আগে অসম্ভব ছিল।’

দ্রুত শনাক্তকরণ ও উন্নত ফলাফল :

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, গো-ডেটা ব্যবহারের ফলে ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং মৃত্যুর হার কমেছে। এটি চালুর পূর্বে কাগজভিত্তিক পদ্ধতি কেস রেজিস্ট্রেশন করতে তিন দিন পর্যন্ত সময় নিত, যে সময়ে সংক্রমণ বিনা বাধায় চলতে থাকত। ২০১৯ সালের মধ্যভাগের পর থেকে দ্রুত রিপোর্টিং এবং দ্রুত ফলোআপের মাধ্যমে ডিফথিরিয়া প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে দ্রুত কেস শনাক্তকরণ, সময়মতো কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং তাৎক্ষণিক ক্লিনিক্যাল ইন্টারভেনশন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। ফলে ডিফথিরিয়ায় মৃত্যু কমে দাঁড়ায়—২০১৭ সালে ৩০ জন এবং ২০১৮ সালে ১৪ জন থেকে কমে ২০১৯ সালে মাত্র তিনজনে, ২০২০ সালে শূন্যে, ২০২১ সালে পাঁচজনে এবং ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে তা শূন্যে গিয়ে পৌঁছায়। একই সময়ে কেস রেজিস্ট্রেশন এবং কন্টাক্ট ফলোআপের সময়ও সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টায় নেমে আসে, যা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এবং আরও জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে।

সংস্থাটি বলছে, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলার সময় গো-ডেটা র‍্যাপিড ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রেসপন্স টিমকে কেস ও কন্টাক্ট ট্র্যাক করতে সহায়তা করেছে। ২০২১ সালের ২ মের মধ্যে ৫৪১টি নিশ্চিত কোভিড কেসের মধ্যে ৫৪১টিই তদন্ত করা হয় এবং ১ হাজার ৯৯০ জন কন্টাক্ট রেজিস্টার করা হয়, যার মধ্যে ১ হাজার ৬২৪ জন (৮২ শতাংশ) ফলোআপ সম্পন্ন করেছিলেন। ২০২১ সালের আগস্ট নাগাদ ২ হাজার ৪৭৫টি নিশ্চিত কেসের মধ্যে ২ হাজার ৩৪টি তদন্ত করা হয় এবং ৪ হাজার ৩৫৬টি কন্টাক্ট শনাক্ত করা হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ৬৭৭ জন (৬১ শতাংশ) ফলোআপ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ২৪৮ জন কন্টাক্ট (৯.২ শতাংশ) পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন।

জাতীয় প্রস্তুতি অগ্রাধিকারের সমর্থন :

কক্সবাজারের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কর্মরত দলগুলোর প্রাদুর্ভাব আরও ভালোভাবে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল টুল কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই উদ্যোগটি জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়া প্রদান, নজরদারি জোরদার করা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে ডব্লিউএইচওর অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থাকে সহায়তা করে।

ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশিদ মোহাম্মদ বলেন, ‘ডিজিটাল টুল, প্রশিক্ষিত দল এবং শক্তিশালী সমন্বয়ের এই মেলবন্ধন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রাদুর্ভাব প্রস্তুতি জোরদার করার একটি চমৎকার ও স্কেলযোগ্য মডেল তৈরি করেছে।’

ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য সংকটের জন্য শিক্ষা :

মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, বিদ্যমান সিস্টেমগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং স্থানীয় মালিকানা উৎসাহিত করার মাধ্যমে গো-ডেটার সাফল্য অর্জন করা হয়েছে। কম সম্পদ ও কম সংযোগের পরিবেশেও এর অফলাইন কার্যকারিতা এবং মানসম্মত কর্মপ্রবাহ একে রোগতাত্ত্বিক রিপোর্টিংয়ের জন্য কার্যকর করে তুলেছে। এছাড়া আগে থেকেই প্রশিক্ষিত কর্মী থাকায় নতুন হুমকি দেখা দিলে দ্রুত তা সক্রিয় করা সম্ভব হয়। বর্তমানে গো-ডেটা কোভিড-১৯ এবং ডিফথিরিয়া প্রাদুর্ভাবের ক্লাস্টারগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে শরণার্থী শিবিরগুলোতে দ্রুত কেস শনাক্তকরণ, কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং সময়মতো হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

এই অর্জনগুলোর ওপর ভিত্তি করে, গো-ডেটা ব্যবহার করে সক্রিয় কলেরা রিপোর্টিং শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এটি প্রাথমিক শনাক্তকরণ জোরদার করবে, দ্রুত ফলোআপ নিশ্চিত করবে এবং এমন একটি রোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আরও ভালো ধারণা দেবে যা কক্সবাজারে বিশেষ করে বর্ষাকালে একটি পুনরাবৃত্ত ঝুঁকি হিসেবে থেকেই যায়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 Asbd24.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102